অতিমারি কোভিড-১৯ : একটি নিরাপদ পৃথিবী, প্রতিষেধক ও প্রকৃতির প্রত্যাশা

ড. মো. হারিছ উদ্দিন

কোভিড-১৯ অতিমারিতে বিপর্যস্ত পৃথিবীর সমগ্র কুল মাখলুকাতের প্রত্যাশা একটি নিরাপদ পৃথিবী, কভিড আক্রান্ত কিংবা আক্রান্তের ভয়ে তটস্ত সমগ্র মানব মন্ডলীর প্রত্যাশা একটি কার্যকর ও নিরাপদ প্রতিষেধক এবং সামষ্টিক মানুষের বিপরীতে কতিপয় অর্থলিপ্সু, বিত্তবান, প্রাচুর্যবান, উচ্চাবিলাসী, লোভী, সিংহভাগ সম্পদ লুন্ঠনকারী, লগ্নীপূঁজি মুনাফাবাজ, অস্ত্রব্যাবসায়ী যুদ্ধবাজ, কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রক, অসম ও বৈষম্যপূর্ণ বিশ্ব ব্যাবস্থার নিয়ন্ত্রণকারী মানুষের রিরংসার শিকার ঝোঁপ-ঝাড়-বনজঙ্গল, জল-জলাভূমি-জলাশয়, খাল-বিল-পাহাড়-নদী, ফুল-ফল-পাখপাখালি-জীববৈচিত্র্যসহ জলে-স্থলে-অরণ্যে বসবাসরত অস্তিত্ব সংকটে থাকা সকল মজলুম প্রাণিকুলের প্রত্যাশা একটি নিরাপদ প্রকৃতি, প্রতিবেশ ও পরিবেশ।চতুর্থ শিল্প বিল্পবের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান পৃথিবী কোভিড-১৯ অতিমারিতে আজ নজিরবিহীনভাবে থমকে গেছে।লকডাউনের কারণে সমগ্র মানব মন্ডলীর কোনো কর্ম ব্যস্থতাও নেই।বলতে গেলে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আজ ঘর বন্দী।দ্রুত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে দেশে বিভিন্ন প্রাণ-পৃকিতি-পরিবেশ বিনাসী সকল উন্নয় কর্মযজ্ঞও বন্ধ হয়ে গেছে।বন্ধ রয়েছে ক্ষুদ্র-মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প-কল-কারখানার উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপনন।জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকসহ সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।পৃথিবীব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে দীর্ঘ ছুটি।প্রশ্ন হলো যে অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে ব্যস্ততম পৃথিবী আজ স্থবির ও স্তব্ধ হয়ে গেছে তার উৎপক্তি কিভাবে এবং এর জন্য দায়ি কে বা কারা? কোভিড-১৯ এর উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করছেন কিন্তু এখনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পরেনি।এর উৎপত্তি নিয়ে দু’টি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে।এর একটি হলো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যা আমিরিকা এবং তার কিছু পশ্চিমা মিত্র দাবি করছে এটি একটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি জীবানু ভাইরাস যার উৎপত্তি হলো চীন।অর্থাৎ চীন ইচ্ছে করেই এই জীবানুটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে।বাণিজ্য যুদ্ধ ও হংকং সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে চীন এটি ছড়িয়ে।যদিও চীন কতৃপক্ষ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে।অন্য আরেকটি তত্ত্ব হলো করোনা ভাইরাস প্রাণি থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে।চীনের একটি পশু-পাখি কেনা বেচার বাজার থেকে এটি ছড়িয়েছে থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা।অর্থাৎ করোনা ছড়িয়েছে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই।অধিকাংশ বিজ্ঞানীই একমত যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিনাশী কর্মকান্ড ও জীববৈচিত্র ধংসের ফলেই কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে।তার মানে বিজ্ঞানীরা বলার চেষ্টা করছেন যে মানুষের অতি লোভ, লাভ ও লালসার কারনেই করোনা নামক মহামারি অভিশাপ হিসেবে মানুষের ওপর নেমে এসেছে।আবার কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে ১৭৮৪ সালের বাষ্পিয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে প্রথম শিল্পবিল্পবের পরথেকে মানুষ ক্রমাগত পরিবেশ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিনাশী যে ধারাবাহিক কর্মকান্ড করে আসছে তার ফলে পরিবেশের যে ভয়াভহ ক্ষতি হয়েছে করোনা অতিমারির মাধ্যমে প্রকৃতি একদিকে যেমন মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছে তেমনি প্রকৃতির ক্ষতিও পুশিয়ে নিচ্ছে।অর্থাৎ মোদ্দা কথা হলো করোনা মহামারির জন্য দায়ি মানুষের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিনাশী কর্মকান্ড।জাতিসঙ্ঘ একটি প্রতিবেদনে বলেছে-মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকান্ডের কারে লাখ লাখ প্রজাতির উদ্ভিত, প্রাণি বিলুপ্তির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।‘ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন মনিটরিং সেন্টার’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মানবসৃষ্ট কারণে প্রথম শিল্প বিল্পবের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কয়েক হাজার প্রজাতির প্রাণি এবং প্রায় পাঁচশত উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।১৯০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর একটি করে স্তন্যপায়ী প্রাণি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।সমু্দ্রে প্লাষ্টিক ও ইবর্জ নিক্ষেপের কারণে বহু সামুদ্রিক প্রাণি হুমকির মুখে।সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ প্রায় ৯০% প্রাণির পায়ে শিকল পড়িয়েছে যার অনেকগুলো পৃথিবী থেকে চিরতরে হাড়িয়ে গেছে।বিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ বিরোধী এ ধারা অভ্যাহত থাকলে করোনার চেয়েও আরও বড় ধরণের বিপদ মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।সুতরাং প্রাণ ধারণের উপযোগী এ উপগ্রহটিতে মনুষ্য বহির্ভূত প্রাণিকুল নিরাপদে বসবাস করতে না পারলে মানুষের অস্তিত্বও বিলিন হতে বাধ্য করোনাকালে এ সত্যটিই প্রতিভাত হচ্ছে।

অতিমারি কোভিড-১৯ সমগ্র বিশ্বচরাচরের সর্বত্র এভাবে মহাপ্রলয়ের ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়রে কেউ কোনোদিন চিন্তা করেনি।এ ঢেউয়ের তুড়ে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিধর রাষ্ট্র থেকে শুরু করে অধা-শক্তিধর, শক্তিহীন, দুর্বল, আধা দুর্বলসহ সমস্ত রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘ এক যুগে মাথা নোয়াবে, অসহায় আত্মসমর্পন করবে এটি গত কয়েক মাস আগেও ছিলো অকল্পনীয়। পৃথিবীর প্রায় সাতশত কোটি মানুষের উপর অকথ্য অন্যায় আর কমদর্য জুলুম, জবরদস্তি চাপিয়ে দিয়ে নির্বোধ, আত্মঅহংকারী আর দাম্ভিক বিশ্ব মোড়লেরা যে অবিচারের রাজন্য কায়েম করেছিলো তা আজ সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বন্ধ হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন আর আফগানিস্তানের যে শিশুরা গোলাবারুদের ঝালালো গন্ধ শুঁকে ঘুমাতে যেত আর গোলাগোলির আওয়াজ শুনে আর্তচিৎকারে জেগে ওঠতো সেসব যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় করোনা আতঙ্ক থেকেও যুদ্ধাতঙ্ক অনেক বেশি ভয়ংকর।মুত্যুভয়কে তুচ্ছ করে ডিঙ্গি নৌকা বা স্পীডবোডে ভূমধ্যসাগর আর আরব সাগর পারিদিয়ে নিরাপদ জীবনের সন্ধানে ইউরোপমুখী অবিভাসী মানুষের স্রোত আপাদত বদ্ধ।কেননা ইউরোপই এখন পৃথিবীর সবচাইতে অনিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।ইউরোপে করোনা আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর মিছিল অবিভাসী মানুষের মিছিলকে রুখে দিয়েছে।এখন ইউরোপকে মৃত্যুপুরী বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না।(সম্প্রতি ইউরোপে মৃত্যুর হার কমে এসেছে)সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী, অস্ত্রব্যাবসায়ী আর যুদ্ধবাজ উন্নত বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রনায়কেরা ভেবেছিলো যে পৃথিবীর প্রান্তিক মানুষের অধিকার, জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম আর সম্মান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *