কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি মৃৎশিল্প

লালপুর প্রতিনিধি
সাব্বীর আহমেদ মিঠু

এক সময় পাল পাড়ার মাটির তৈরী তৈজসপত্রের কদর ছিলো সারা দেশে। সে কারণে কুমাররা ব্যস্ত সময় পার করতো মাটির হরেক রকমের তৈজসপত্র তৈরীতে।কালের বির্বতনে ও আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়াতে বর্তমানে পথে বসেছে কুমাররা।

আগের মতো মাটির তৈরী থালা,ভাত রান্নার পাতিল,মুড়ি তৈরির ঝাজর,পানের বাটা,মাটির ব্যাংক, ঢাকনা, কলসি সহ বিভিন্ন তৈজস পত্রের তেমন কদর এখন আর নেই। ফলে অনেকে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি মৃৎশিল্পের পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছে।আধুনিক প্রযুক্তিতে উৎপাদিত প্লাস্টিক, ম্যালামাইন আর অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি তৈজসপত্র বর্তমান বাজার দখল করেছে।যার প্রেক্ষাপটে কুমোর পাড়ায় পোড়ামাটির সুগন্ধে আর মাটির তৈজসপত্র তেমন ভালো পোড়েনা।

নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়ীয়া ইউনিয়নের পালপাড়া,বাকনা-মোমিনপুর পালপাড়া,বিলমাড়ীয়া ও মাধবপুর পাগলপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়,উপজেলার ঐ সকল পালপাড়ার প্রতিটি এলাকায় এক সময় ২০/২৫টির ও বেশি পরিবার মাটির তৈজসপত্র তৈরী করতো,কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বিলুপ্ত হয়ে এখন তা এসে দাড়িয়েছে মাত্র৬-৭টি পরিবার।লালপুর উপজেলার দুড়দুড়ীয়া ইউনের কুমারপাড়ায় গিয়ে কুমারদের বর্তমান অবস্থান পরিলক্ষিত করা হয়।দেখা গেছে, পুরুষদের পাশাপাশি মহিলা কুমাররা ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি ভাতের হাঁড়ি,রুটি তৈরির তাওয়া, মালসা, পানির কলস, ফুলের টব, ফুলদানি, ঢাকনা, কলসি, দেব-দেবীর মূর্তিসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন তৈজস পত্র নিপুণ ভাবে ও সৌন্দর্যর সহিত তৈরি করছে। তাদের তৈরি পণ্য গুলো উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন জেলাসহ ঢাকাতেও বাজারজাত করা করা হয়।

এ বিষয়ে লেঃ কর্ণেল রমজান আলী সরকার (অবঃ)জানিয়েছেন,মাটির তৈরি তৈজসপত্রের বিশেষত্ব হলো,এগুলো শুধু ব্যবহারিক পণ্যরূপেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এসব শিল্পের সঙ্গে শৈল্পিক প্রলেপ জড়িয়ে থাকে। এছাড়া এগুলো পরিবেশবান্ধব। এসব তৈজসপত্রের মধ্যে বাঙালির শৈল্পিক ধারার নিদর্শনও লক্ষ করা যায়। আজকাল এসব পণ্য শৌখিন পরিবারগুলোর ড্রইংরুমের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলছে। অথচ এমন একটি সময় ছিল যখন বাংলার প্রতিটি ঘরেই এসব পণ্য ব্যবহৃত হতো। নিজস্ব উপকরণ এবং কৌশলে তৈরি তৈজসপত্র আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু পুঁজি আর আধুনিকতার যুগে মানুষের মন-রুচির যত পরিবর্তন ঘটেছে, ততই মাটির তৈরি তৈজসপত্রের গুরুত্ব কমেছে। ফলে বিবর্তনের ধারায় কুমার পেশা আজ লুপ্তপ্রায়। তবুও যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় অনেকেই ঐতিহ্যের মধ্যে আনন্দ খোঁজে। কুমারদের মধ্যেও কেউ কেউ ঐতিহ্যবাহী এ পেশাকে একেবারে বর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে দেশের পরিচিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে দেশীয় তৈজসপত্রের গুরুত্ববহ ভূমিকা রয়েছে।

বংশপরম্পরায় এ পেশার সাথে যুক্ত উপজেলার বাকনা-মোমিনপুর কুমারপাড়া গ্রামের মৃতঃ অনন্ত চন্দ্র পালের ছেলে রবিন চন্দ্র পাল বলেন, আমার দাদা ও বাবা এ পেশায় যুক্ত ছিলো আমিও এখনো যুক্ত আছি, আমাদের সংসার আগে সচ্ছলভাবে চললেও বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আর্থিক সংকট লেগেই আছে, মাটির তৈরী তৈজসপত্র মানুষ আর তেমন কিনতে চায়না, কিন্তু চাহিদা থাকায় এখন ফুল গাছের টব এবং দইয়ের হাঁড়ি বেশি বিক্রি হয়।

এ পেশার সাথে সংযুক্ত আরেক কুমোর নারায়ন চন্দ্র পাল বলেন,বিশ্বায়নের নামে নিজস্ব ঐতিহ্য পরিত্যাগ করা উচিত নয়, পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তার ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়েই আধুনিকতার দিকে ধাবিত হয়েছে। এ অবস্থায় অন্যান্য কারুশিল্পের মতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র তৈরির ধারাটির সুরক্ষা আবশ্যক। এজন্য চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈজসপত্র তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে, সেটা কিছুটা হচ্ছেও বটে। যেমন কুমাররা পোড়ামাটির, টব, খুঁটি ও রিং তৈরি করছে।

প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুর রশিদ মাষ্টার বলেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়,কুমোরদের চাহিদাসম্পন্ন পোড়ামাটির সরঞ্জাম তৈরির প্রশিক্ষণ এবং দেশের অভ্যন্তরে রপ্তানির ব্যবস্থা করা গেলে এ খাতের উন্নতি ঘটবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
এছাড়া মাটির তৈরি তৈজসপত্রর পরিবর্তে বর্তমানে ম্যালামাইন,প্লাস্টিক ,এ্যালুমিনিয়াম ও সিলভার জাতীয় পন্য ব্যাবহারে মানবদেহর ব্যাপক ক্ষতি সহ জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *