পাবনার চাটমোহরে ১২ বছর ধরে শিকলে বন্ধী ইজাজুল

প্রতিদিন সকালে বাড়ির সামনের গাছতলায় শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় তাকে। আর রাত হলে বাড়ির বাইরে উঠানের মাঝে একটি ভাঙ্গাচোরা পাঠকাঠির বেড়া দিয়ে তৈরি টিনের ছাপড়া ঘরে ঘুমহীন রাত কাটে তার। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে মানুষের দিকে। কথা বলতে চায় সবার সাথে। বাবা-মা বেঁচে থাকতে চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু তারা মারা যাওয়ায় এখন চিকিৎসা বন্ধ। 

পাবনার চাটমোহর উপজেলার গুনাইগাছা ইউনিয়নের দড়িপাড়া গ্রামের মৃত মনতাজ প্রামানিকের ছেলে ইজাজুল পরিবারের কাছে এখন বোঝায় পরিণত হয়েছে। তবে উন্নত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন ইজাজুল। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে স্বজনরা চিকিৎসা করাতে পারছেন না এমনই দাবি তাদের।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ৬ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে চতুর্থ ইজাজুল। জন্মের কয়েক বছর পর ইজাজুলের মানসিক ভারসাম্য হারানোর বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে ইজাজুল। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। অর্থভাবের মধ্যেও ছেলেকে (ইজাজুল) সুস্থ করতে স্থানীয় চিকিৎসক ও কবিরাজকে দিয়ে চিকিৎসা করান। কিন্তু সুস্থ না হওয়ায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। ওষুধ খাওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয় ইজাজুল। 

এদিকে মারা যান বাবা মনতাজ প্রামানিক। অন্য ভাইয়েরা বিয়ে করে সংসার নিয়ে আলাদা হয়ে যান। বন্ধ হয়ে যায় ইজাজুলের চিকিৎসা। কে রাখে কার খোঁজ! প্রতিবেশীরা স্বজনদের কাছে নানা অভিযোগ করা শুরু করে। এরমধ্যে কোনো একদিন পথ হারিয়ে নিখোঁজ হন ইজাজুল। প্রায় ছয় মাস পর অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্বজনরা তাকে খুঁজে পেয়ে শেকল বন্দি করে রাখা শুরু করে।

সেই থেকেই শেকল বন্দি জীবন শুরু হয় ইজাজুলের। তবে মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে আগলে রাখেন মা তছিরণ খাতুন। মা-ই ছিলেন ইজাজুলের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সে সুখও কপালে সয়নি তার। বছর চারেক আগে তছিরণ খাতুন মারা যাওয়ায় ইজাজুলের কষ্ট আরো বেড়ে যায়।

ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদেরও সংসার আছে। বাবা বেঁচে থাকতে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। তবে সরকারি সহায়তায় পেলে এবং উন্নত চিকিৎসা দেয়া গেলে হয়তো ভাই (ইজাজুল) সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে গুনাইগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ইজাজুল নামের ওই যুবকের শেকল বন্দি অবস্থার খবর পেয়ে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু শীতের মধ্যে যেভাবে সে ভাঙ্গা ঘরে শেকল বন্দি অবস্থায় থাকে সেটা দেখে খুব কষ্ট লেগেছে। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *