পাবনার নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বিনা চিকিৎসায় ভুগছেন

আশেপাশের দশ গ্রামের নারীরা যখন প্রাণভয়ে সবকিছেু ফেলে ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন তখন কোলের সন্তান রেখে দেশমাতৃকার টানে অস্ত্র হাতে জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভানু নেছা। মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কারে গোলাবারুদ সরবরাহ, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণসহ নানা ভাবে মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিলেন অসামান্য ভূমিকা। সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে কপালে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

কিন্তু, গত প্রায় ছয়মাস ধরে ভাল নেই স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানী পাবনার তালিকাভুক্ত এবং জীবিত একমাত্র এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। বাধ্যর্কজনিত নানা জটিল রোগে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বর অসুস্থ্য হয়ে শয্যাশায়ী তিনি। রণাঙ্গনের অসীম সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার সুচিকিৎসার দায়িত্ব নেবে সরকার, দাবী সহযোদ্ধা ও স্থানীয়দের।

সরেজমিনে শনিবার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় তেঁতুলিয়া গ্রামের ভানু নেসার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পৌষের শীতেও কুঁড়েঘরের মেঝেতে শুয়ে আছেন প্রায় আশি বছর বয়সী এই বৃদ্ধা। পুত্রবধু সূর্য খাতুন কমলা লেবুর রস করে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন।

কেমন আছেন জানতে চাইলে ইশারায় এই প্রতিবেদককে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে ভানু নেসা ভেঙে পড়েন কান্নায়। সূর্য খাতুন জানালেন, প্রায় ছয় বছর ধরে ভানু নেছা। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। তবে, গত ছয় মাস ধরে অবস্থার ক্রমাবনতি হয়েছে। হাঁটা চলার শক্তি হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি হারিয়ে ফেলেছেন কথা বলার শক্তিও। দশ সদস্যের পরিবারে দিনমজুর সন্তানদের সীমিত আয়ে সম্ভব হয়নি উন্নত চিকিৎসা। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও তার সবটুকুই চলে যায় দুধ, ফল ও ঔষধ কিনতেই। ধারদেনা করে ছেলেরা দুইবার নিয়ে গেছেন ঢাকায় । কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকায় এখন বাড়িতেই ফেলে রেখেছেন।

উন্নত চিকিৎসায় সরকারের সহায়তা চেয়ে ভানু নেছার নাতী মনিরুল ইসলাম বলেন, দাদীকে এখন তিলে তিলে নিঃশেষ হতে দেখে খুব কষ্ট হয়। তিনি খুব শক্তিশালী ও দৃঢ় মনোবলের মানুষ ছিলেন। আমাদের সব সময় শাসনে রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কত গল্পই না তিনি বলেছেন। অথচ এখন তিনি বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। দেশের জন্য যে মা নিজের জীবনের মায়াই শুধু নয় কোলের সন্তানের কথাও ভাবেন নি, তাঁর জীবন বাঁচাতে কি রাষ্ট্র কিছুই করবে না?

সাথিঁয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাঁথিয়ার ধূলাউরি, ধোপাদহ, রাজাই প্রামানিকের বাড়িসহ বিভিন্ন রণাঙ্গণে ভানু পুরুষ যোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন সম্মুখ সমরে। ডিসেম্বরের আট তারিখে মাধপুর এলাকায় পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধ চলাকালে আমাদের গুলি শেষ হয়ে যায়। ভানু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে সেদিন সাঁথিয়া থেকে গুলির বস্তা মাথায় নিয়ে, পৌঁছে দিয়েছেন বাঙ্কারে বাঙ্কারে। কপালে লেগেছে গুলি তবুও পিছু হটেন নি। সেদিন ভানুর সাহসিকতার কারণেই আমরা প্রাণে বেঁচে যাই । অথচ আজ স্বাধীন দেশেই ভানুই ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ভানুর চিকিৎসায় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ জানান, তিনি বাড়িতে গিয়ে তাকে (ভানু নেছা) দেখে এসেছেন। তিনি বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছেন। প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *