পাবনা র‍্যাবের অভিযান কে প্রশ্নবিদ্ধ করলো পুলিশ

পাবনা প্রতিনিধি : ভিজিএফের চালচুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ঢালারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কোরবান আলীর পক্ষে ঘুষের বিনিময়ে চুড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ফেঁসে গেছেন পাবনার আমিনপুর থানার ওসি এস এম মাইনুদ্দিন।
ঘটনায় প্রকাশ, বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কোরবান আলী সরদার ভিজিএফের ২২৯ বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে না রেখে রূপপুর ইউনিয়নের বাঁধেরহাটে নিজ ব্যবসায়িক গুদামে মজুদ করছিলেন।
গত ১৩ এপ্রিল রাতে এমন খবর পেয়ে র‌্যাব-১২ পাবনা ক্যাম্পের কমান্ডার আমিনুল কবীর তরফদারের নেতৃত্বে র‌্যাব সেখানে যায় এবং হাতে নাতে এই চালসহ চেয়ারম্যানকে আটক করে। চালসহ ফেঁসে যান চেয়ারম্যান কোরবান।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিক সত্যতা মেলায় র‌্যাব-১২ ডিএডি মো. সোহরাব আলী বাদী হয়ে ঐ রাতেই আমিনপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে, অভিযুক্ত চেয়ারম্যানকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায়, গত ১৯ মে চাঞ্চল্যকর এই মামলাকে ‘তথ্যগত’ ভুল দাবী করে র‌্যাবের অভিযোগকে অসত্য বলে কোরবান আলী সরদারকে অব্যাহতি দিয়ে চুড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আমিনপুর থানা পুলিশ।
চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের আতঙ্কে কোরবান সর্দার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুদ করা চালসহ র‌্যাব উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যানকে আটক ও মামলা দায়ের করলেও, আভিযোগ অসত্য দাবী করে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এ মামলা নিয়ে র‌্যাব ও পুলিশের পরস্পর বিরোধী অবস্থানে জেলায় চলছে তোলপাড়।
এ ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশের পরস্পর বিরোধী অবস্থানে ব্যপক কানাঘুষা শুরু হয়।
ত্রাণচুরি কান্ডে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে ভিজিএফ কার্ডধারীদের কারো সাক্ষ্য না নিয়েই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আসমা খাতুন ও জহিরুন বেগম অভিযোগ করেন, গত ১৫ মাস আগে ভিজিএফের চালের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও তাদের কার্ড বা চাল কিছুই দেয়া হয়নি। চেয়ারম্যান কোরবান সর্দার র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর তার লোকজন বাড়িতে গিয়ে কার্ড পৌঁছে দেয়, এবং কাউকে কিছু না জানাতে শাসিয়ে আসে।
এখন শুনছি আমাদের নামে বরাদ্দ হওয়া চাল তারা প্রতি মাসেই তুলে নিয়েছে। ৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মন্তাজ মন্ডলসহ আরও অনেকেই একই ধরণের অভিযোগ করেন।
ঢালারচর চৌধুরী পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল জলিল ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে ঢালারচরে কল্পনাতীত উন্নয়ন হয়েছে। রাস্তাঘাটের পাশাপাশি চালু হয়েছে রেল যোগাযোগ।
এক সময় চরমপন্থী এলাকা বলা হলেও, গত দশ বছরে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি জেলার যে কোন অঞ্চলের চেয়ে ভালো।
এরপরও সন্ত্রাস ও দূর্গম এলাকা দাবী করে চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদে না রেখে ত্রাণের চাল প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিজ গুদামে রাখেন কেবল আত্মসাতের উদ্দেশ্যে। নিরপত্তা না থাকলে তিনি কেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তা চাননি?
ঢালারচর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল লতিফ বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব সরকারি সুবিধা নিজস্ব কিছু লোককে ছাড়া কাউকেই দেন না। দরিদ্রদের নামে চাল তুলে চেয়ারম্যানের ছেলে ও ভাতিজা সেগুলো বিক্রি করে দেন।
এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে পরিষদে ডাকা হয়না। তারা ইচ্ছেমত যা খুশি তাই করেন। চেয়ারম্যান আটকের পর ভেবেছিলাম তার বিচার হবে, অথচ পুলিশ নাকি কোন দোষই খুঁজে পায় নি।
এদিকে, চালচুরির অভিযোগ ওঠায় ইউপি চেয়ারম্যান কোরবান আলীকে গত ১৪ এপ্রিল কেন্দ্রের নির্দেশে দল থেকে বহিষ্কার করে জেলা আওয়ামীলীগ। তাকে বাঁচাতে তদবির করায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দলীয় সকল পদ থেকে অব্যহতি দেওয়া হয় বেড়া উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও পৌর মেয়র আব্দুল বাতেনকেও।
অভিযোগ উঠেছে, দলীয় পদ পদবি হারিয়ে বেড়া পৌর মেয়র আব্দুল বাতেন এবং কোরবান আলী জোটবদ্ধ হয়ে পাবনা- ২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবিরকে সাথে নিয়ে র‌্যাবের অভিযানকে বিতর্কিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন।
তাদের নির্দেশেই আমিনপুর থানার ওসি এসএম মঈন উদ্দিন ঘুষের বিনিময়ে মামলা থেকে বিতর্কিত চেয়ারম্যানকে অব্যহতির সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন।
তবে, প্রভাবিত হয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি ওসি এস এম মাইনুদ্দিন। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দায়সারা কিংবা পক্ষপাতিত্ব হয়েছে কিনা সেটা বিবেচনা করবে আদালত।
অভিযোগ অস্বীকার করে, বিষয়টিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবীর ও বেড়া পৌর মেয়র আব্দুল বাতেনও।
তবে, পুলিশের এমন তদন্ত প্রতিবেনে বিস্ময় প্রকাশ করে, র‌্যাব- ১২ এর কমান্ডিং অফিসার লে.কর্ণেল খায়রুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযানের পর নিশ্চিত হয়েই র‌্যাব অভিযুক্ত চেয়ারম্যানকে আটক ও মামলা দায়ের করে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে অসৎ উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হই। এখানে, তথ্যগত ভুলের প্রশ্নই ওঠে না। পুলিশ কেন এমন প্রতিবেদন দিয়েছে তা আমরা দেখব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *