পাবনা মানসিক হাসপাতাল চলছে ছয় জন ডাক্তার দিয়ে

পাবনা মানসিক হাসপাতাল, চিকিৎসক সংকটে সেবা ব্যহত মাত্র ৬ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’। হাসপাতালের জন্য অনুমোদন রয়েছে ২০০ শয্যার জনবল। এই ২০০ শয্যার জনবলের জন্য প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের যে ৩০টি পদ মঞ্জুর আছে তার মধ্যে আবার ২৪টি পদই রয়েছে শূন্য।

প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের ৮টি পদের মধ্যে দু’জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, একজন সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কার এবং একজন এসএলপিপি’র পদ শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৫টি পদের বিপরীতে ২২টি পদ শূন্য; যার মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ একজন সিনিয়র নার্স এবং ২২ জন স্টাফ নার্সের পদ শূন্য রয়েছে।

এ কারণে সমস্যার পাহাড় নিয়ে এখন নিজেই এক রোগাক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে পাবনা মানসিক হাসপাতাল।

কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, এত সমস্যার মধ্যেও মুজিববর্ষকে সামনে রেখে একটি পরিচ্ছন্ন সেবামূলক আদর্শ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছেন এখানকার কর্মরত চিকিৎসক-কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা।

এদিকে ৬২ বছর আগে নির্মিত বিভিন্ন ভবনের ইলেকট্রিক ও পানির লাইনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী, চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসযোগ্য কোনো কোয়ার্টার নেই। অব্যবস্থাপনার সুযোগে হাসপাতালের আশপাশে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কিছু বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল। এদের নিয়োগ করা দালালদের অত্যাচারে কর্তৃপক্ষ অতিষ্ঠ। এদিকে অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে গেলেও তারা রয়ে গেছেন এখানেই। ২৮ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সুস্থ হয়েও এখনও অনেকেই থেকে গেছেন মানসিক হাসপাতালে। তাদের কেউ নিতে আসেন না বা ভুল ঠিকানার কারণে কর্তৃপক্ষও তাদের আসল ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারছে না। এদের নিয়ে কর্তৃপক্ষ এখন মহাসংকটে।

জানা যায়, বাংলাদেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালটি পাবনা জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে হেমায়েতপুরে অবস্থিত। ১৯৫৭ সালে পাবনা জেলার প্রাক্তন এক সিভিল সার্জন ‘শীতলাই হাউজ’ নামক জমিদার বাড়িতে এটি অস্থায়ীভাবে স্থাপন করেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী কোনো সরকারই এটিকে আধুনিকায়নসহ এর সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এদিকে চিকিৎসকের মঞ্জুরিকৃত ৩০টি পদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ৬ জন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পরিচালক এবং আরএমও অবসরে গেলে মেডিকেল অফিসার ডা. ওমর ফারুক বুলবুল দায়িত্বে রয়েছেন। তার আগে থেকে ডা. বুলবুল তত্ত্বাবধায়ক পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক পদে একজনকে পোস্টিং দেয়ায় এখনও ডা. বুলবুল পরিচালক ও আরএমওর দায়িত্বে রয়েছেন।

সূত্র জানায়, হাসপাতালের কনসালট্যান্টের দুটি পদের দুটিই, ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার দুটি পদের দুটি, সহকারী রেজিস্ট্রারের তিনটি পদের তিনটিই শূন্য। অবেদনবিদ, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ও বায়োকেমিস্টের একটি করে তিনটি পদের তিনটিই শূন্য। ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের নয়টি পদে আছেন পাঁচজন। আর চারজন সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কারের মধ্যে আছেন তিনজন। একইভাবে চিকিৎসকসহ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অন্য কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মঞ্জুরিকৃত ৫২২ জনবলের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৫১টি পদ।

কর্তৃপক্ষ বলছেন, এত স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে মানসম্পন্ন সেবা তো দূরের কথা, হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চলমান রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে হাসপাতালটিতে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে একটি টিইইজি, একটি ইসিটি, একটি অটোকেভ ও একটি ইসিজি মেশিন চালু করা সম্ভব হয়নি। একটি অ্যাম্বুলেন্স কোনোমতে চালু রাখা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই এটি নষ্ট থাকে। চিকিৎসক, নার্র্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবহনের জন্য কোনো যানবাহন নেই। ৬২ বছর পূর্বে নির্মিত ভবনগুলোর ইলেকট্রিক ও পানির লাইনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় পুনঃঅপসারণ এবং অনেক জায়গায় পুনঃনির্মাণ জরুরি। রোগীদের আধুনিক এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য কর্মরত চিকিৎসকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের (বৈদেশিক ট্রেনিং) প্রয়োজন হলেও তার কোনো ব্যবস্থা নেই। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা মানসিক হাসপাতালের ১৪টি ওয়ার্ডে রোগীদের রাখা হয়। এর মধ্যে ৭টি ওয়ার্ডের অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

মেডিকেল অফিসার ডা. ওমর ফারুক বুলবুল জানান, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাবনা মানসিক হাসপাতালের সেবার মান দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু এভাবে সমস্যা জিইয়ে রেখে এ সেবা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত কঠিন। পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানসিক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *