স্বাস্থ্য অধিদফতরে কিট সংকট, করোনা পরীক্ষা নিয়ে শঙ্কা

ঢাকা: দেশে যেভাবে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে প্রতিদিন আরও বেশি বেশি নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিন ন্যূনতম ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও। তবে গত কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ উল্টো কমছে। এর মধ্যে দেশের একাধিক করোনা ল্যাব জানিয়েছে, কিট না থাকায় পরীক্ষা করতে পারছে না তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাতে থাকা কিটের সংখ্যা হাজারেরও কম!

সোমবার (২২ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরে করোনা পরীক্ষার কিট রয়েছে এক হাজারেরও কম! স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ নিজেও সারাবাংলার কাছে কিট সংকটের এ তথ্য স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে তিনি এ-ও বলছেন, কিট সংকট সমাধানে অধিদফতর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ফলে কিট সংকটের সমাধানও হবে ‘শিগগিরই’।

কিট সংকটে অধিদফতর

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবের সংখ্যা বাড়ালেও এখন পর্যন্ত সব ল্যাবে পর্যাপ্ত কিটের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিজের কাছেই পর্যাপ্ত কিটের সংস্থান এখন নেই। রোববার (২১ জুন) রাতের তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাতে থাকা কিটের সংখ্যা সাকুল্যে ৯৮৪টি! সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্তও অধিদফতরের কাছে নতুন কোনো কিট পৌঁছেনি।

নমুনা পরীক্ষার চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুন বাংলাদেশে ১৭ হাজার ৫২৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে সারাদেশে, যা একদিনে সর্বোচ্চ। পরদিন ১৮ জুন নমুনা পরীক্ষা নেমে আসে ১৬ হাজার ৫২৯টিতে। ১৯ জুন এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৪৫টি, ২০ জুন আরও কম— ১৪ হাজার ৩৪টি। ২১ জুন নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৫৮৫টিতে, ২২ জুন নমুনা পরীক্ষা ছিল ১৫ হাজার ৫৫৫টি। জানা যায়, সোমবার টানা চতুর্থ দিনের মতো করোনা পরীক্ষা বন্ধ ছিল করোনার অন্যতম হটস্পট নারায়ণগঞ্জের ৩শ শয্যা হাসপাতালে।

কিট সংকটে পরীক্ষা বন্ধ
রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি ল্যাবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের হাতে কিট রয়েছে সামান্য পরিমাণে, যা দিয়ে দুই থেকে চার দিন নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। দৈনিক ১৮০ নমুনা পরীক্ষা করে থাকে— রাজধানীর এমন একটি ল্যাবে রোববার রাতে কিট ছিল ৬০০টি। দৈনিক তিন থেকে চারশ নমুনা পরীক্ষা করা আরেকটি ল্যাবে কিট ছিল ৭০০। রাজধানীর বাইরে একাধিক ল্যাবের অবস্থাও ছিল একই।

জানা গেছে, যেসব ল্যাবে কিট একটু বেশি আছে, তাদের কাছ থেকে নিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিট শূন্য হয়ে পড়া ল্যাবগুলোতে! এর মধ্যে নোয়াখালী আব্দুল মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজের ল্যাবেও বৃহস্পতিবারের (১৮ জুন) পর থেকে কোনো নমুনা পরীক্ষা হয়নি। কয়েকদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ বেড হাসপাতালের ল্যাবেও করোনা পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে কিট জটিলতায়।

কিট সংকট যেভাবে
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি দেখা দিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিট দিয়ে দেশে শুরু হয় করোনা পরীক্ষা। সংস্থাটি বিভিন্ন সময় বেশকিছু কিট উপহার দিয়েছে বাংলাদেশকে। কিট উপহার পাওয়া গেছে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও। এর বাইরে একটি প্রতিষ্ঠান অধিদফতরকে কিট সরবরাহ করে আসছিল। এর মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় করোনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় অধিদফতর। নতুন কিছু প্রতিষ্ঠানকে কিট আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সময়মতো কিট আনতে না পারা ও আনার পরে ভ্যালিডেট করতে না পারায় তাদের অনেকের ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করা হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে তিন প্রতিষ্ঠানের কিট স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে আনা হয়েছে। এর মধ্যে শুরু থেকে কিট সরবরাহ করে আসা প্রতিষ্ঠানটির কিটের পরিমাণ নেমে এসেছে শূন্যের কোটায়। বাকি দুইটি প্রতিষ্ঠান যে কিট এনেছে, সেগুলো এতদিন ধরে দেশে ব্যবহৃত কিটের চেয়ে আলাদা ধরনের। সেগুলোতে এক্সট্রাকশনের সময় লাগছে আগের কিটের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কিট দিয়ে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি ও শিশু হাসপাতালসহ কিছু প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা সম্ভব হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এটা দিয়ে নমুনা পরীক্ষায় অনেক বেশি সময় লাগছে।

অধিদফতর সূত্র বলছে, জুনের শুরুতে কিট সংকট চরমে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে শুরু থেকে কিট সরবরাহ করে আসা প্রতিষ্ঠানটি ৬ জুন কিছু কিট সরবরাহ করে। পরে দুই কিস্তিতে আরও ৭০ হাজার কিট সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সারাদেশে যেভাবে করোনা পরীক্ষা চলছে, তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতো না বাড়লেও এই কিট প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। সোমবার অধিদফতরের হাতে থাকা কিটের অবস্থাও তেমনই বলছে। রোববার বিকেল পর্যন্তও অধিদফতরে কিট ছিল দেড় হাজারের মতো। সন্ধ্যায় ঢাকার বাইরের একটি ল্যাবের জন্য কিছু কিট দিয়ে দেওয়ায় অধিদফতরের হাতে কিট দাঁড়ায় হাজারের নিচে।

কিট সংকট সমাধানে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’
কিট সংক্রান্ত বিষয়ে সিএমএসডি’র পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামানের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ সংক্রান্ত কমিটির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা সারাবাংলাকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে এই সমস্যা সমাধানের জন্য। আশা করছি খুব দ্রুতই সমস্যা সমাধান হয়ে আসবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কিট সংকটের কথা স্বীকার করে নেন। তার তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে অধিদফতরের স্টোরে ছিল দেড় হাজারের কিছু বেশি কিট (ঢাকার বাইরের ল্যাবে সরবরাহের পর প্রকৃতপক্ষে কিট ছিল ৯৮৪টি)। আরও তিন হাজার কিট জোগাড় করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মহাপরিচালক বলেন, আমরা সারাদেশের ল্যাবগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করেছি। তাতে দেখা গেছে, অনেক ল্যাবরেটরি বেশ কয়েকদিন চালাতে পারবে তাদের কাছে থাকা কিট দিয়ে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দুয়েকদিনের মধ্যে ৬৮ হাজার কিট দেবে। এত দিন যারা কিট সরবরাহ করছিল, তারাও সরবরাহ করবে। ফ্লাইট নিয়ে তাদের কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে তাদের কিটও চলে আসবে। এর সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিট চলে এলে সমস্যা হবে না আশা করি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই মহাপরিচালক আরও বলেন, আরও এক ধরনের কিট এসেছে বিমানবন্দরে। এই কিট আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, শিশু হাসপাতাল ও আই দেশী ব্যবহার করতে পারবে। কাজেই আশা করছি কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা হাইলি এফিশিয়েন্ট মেকানিজম ব্যবহার করছি এই সমস্যা সমাধানের জন্য। এই সমস্যা সমাধানকে সর্বোচ্চ ‍গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার বিষয়ে তো আমাদের হাত থাকে না।

ডা. আবুল কালাম আজাদ বলের, ৩০ জুন পর্যন্ত আমরা এভাবেই চালাব। এরপরে লম্বা সময়ের জন্য প্রকিউরমেন্ট করা হবে সরকারের পদ্ধতি অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে কিট সরবরাহের জন্য আরও একাধিক কোম্পানি আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *